Breaking News
Home >> Breaking News >> শিয়রে লোকসভা ভোট, কেমন আছে বাম-সন্ত্রাসে কব্জি খোয়ানো আমতা’র কান্দুয়া

শিয়রে লোকসভা ভোট, কেমন আছে বাম-সন্ত্রাসে কব্জি খোয়ানো আমতা’র কান্দুয়া

কল্যাণ অধিকারী, স্টিং নিউজ করেসপনডেন্ট, হাওড়া: বাম আমলে রাতারাতি সন্ত্রাসের শিরোনামে উঠে এসেছিল আমতা’র কান্দুয়া (কাদুয়া)। একের পর এক কংগ্রেস কর্মীদের হাতের কব্জি নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। খতম করে দেওয়া হয়েছিল কংগ্রেস কর্মী গোপাল পাত্র কে। লোকসভা ভোটের আগে কেমন আছে একসময় রক্তের হোলিখেলা আমতার কান্দুয়া।

হাওড়া শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিমি দূরে রামচন্দ্রপুর হাটতলা। ওখান থেকে দেড় কিমি পথ কান্দুয়া মাখাল পাড়া। ইটের মোড়াম রাস্তার উপর বেশ কয়েকমাস হরে পিচের প্রলেপের কাজ শুরু হয়েছে। দু পাশারি খেতি জমি। মাঝেমধ্যে রাস্তার গায়ে ইট বেরিয়ে থাকা ঘর। বেশ কয়েকজন ছোটরা টিউশন পড়ে ফিরছে। মাখাল পাড়া ওরাই দেখিয়ে দিল। তিন মাথা মোড়ে সেদিনকার ভয়ঙ্কর স্মৃতি বিজড়িত পাকা মঞ্চ।

অচেনা মুখ দেখে কয়েকজন এগিয়ে আসলেন। দেখিয়ে দিলেন বাগ পাড়ার রাস্তা। পৌঁছে গেলাম ইটের বাড়ি আর টালির ছাউনি ঘরে। দেখা মিললো নব্বইয়ের ভয়াবহ ঘটনায় আক্রান্ত অষ্টাদশী এখন বছর ছেচল্লিশের ঘণ্টেশ্বর বাগ। পরিচয় জেনে মাটির মেঝেতে চ্যাটায় বসতে বললেন। ডান হাতের বুড়ো আঙুল নেই। হাতটাই কার্যত অকেজো। বাম হাত কব্জি থেকে নামানো। গামছা গায়ে বললেন এখন আতঙ্ক আর নেই। তবুও কিছু লোক শান্তিকে ব্যাঘাত করবার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। এখানকার মানুষ এক হয়েছে। সন্ত্রাস পিছু নিয়েছে।

হাওড়া পুরসভার অধীনে চাকরি করছেন ঘণ্টেশ্বর বাগ। সেদিনের কথা জিজ্ঞাসা করতেই মিনিট খানেক চুপ করে গেলেন। দিনটি ছিল জুন মাসের আঠারো তারিখ সালটা ১৯৯১। ভোটের রেজাল্ট বের হবার পরের দিন। তখন আমার বয়েস আঠারো। সকাল সাতটা’র সময় বাবার ধান ভাঙার কলে ধান ভাঙছিলাম। বাবা পয়সা নিচ্ছে। সিপিএমের সমর্থকরা হৈ হৈ করে এসে ধান কলটা ঘিরে ফেলে। লাঠি দিয়ে বাবা’কে বেধড়ক মারতে থাকে। বাবার কাছে গিয়ে দু’হাত জড়ো করে ওদের ক্ষমা চাইতে থাকি। তখনি আমার দু হাতে তরওয়াল চালিয়ে দেয়। বাম হাতের কব্জি থেকে নেমে যায়। ডান হাতটাও ঝুলতে থাকে। কেটে যায় বুড়ো আঙুল। রক্তে ধানকল ভেসে যেতে থাকে।

পাশে রাখা পাত্রে জল খেয়ে ধাতস্ত হয়ে বলেন, দিলীপ কুমির বাম হাতটা বাদ দেয়। ডান হাতে আঘাত করে শ্যাম বর ও পরিক্ষীত মন্ডল। তারপর বোম মারতে মারতে পঞ্চায়েত সদস্য গোপাল পাত্রর বাড়িতে যায়। গোপাল পাত্র কে তরোয়াল দিয়ে মেরে ফেলে। তারপর একে একে কেশব ধাড়া, রাসু ধাড়া এবং চম্পা পাত্রদের বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনা হয়। হাতের কবজি থেকে কেটে দেওয়া হয়। রক্তে ভেসে যেতে থাকে শরীর। চোট আঘাতে কিছুদিন পর বাবাও মারা যান। যারা তখন এই আক্রমণ চালিয়েছিল তাদের মধ্যে মারা গেছে চাঁদু সিং, বুনো সিং, ভাগ্য সিং, রাখাল সিং। তবে মানুষের চোখের জল বৃথা যায়নি। অনেক কষ্ট পেয়েছে মারা যাবার সময়। পাপ করলে ভগবান কি ছাড়ে!

এলাকার উন্নয়ন কি বদলে দিয়েছে সন্ত্রাসের বাতাবরণ ?

হয়তো এটাই বাস্তব। দেখছেন তো দুটি পিচ রাস্তা হয়েছে। একটি প্রেম রোড থেকে অপরটির কাজ চলছে রামচন্দপুর থেকে। চাষে সেচ দেবার জন্য বোরো খাল (কাদিয়াখাল) সংস্কার করে খাল কাটা হয়েছে। বিদ্যুৎ মিলেছে। মানবিক (হাজার টাকা) প্রকল্পের সুবিধা মিলছে। সুশাসন পাচ্ছি আমরা। আগের তুলনায় শান্তিতে আছি। কথা বলবার মাঝেই আকাশ কালো করে আসে। কালবৈশাখী ঝড় সঙ্গে শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। কাদুয়া পাইমারি স্কুলের কিছুটা দূরে দেখা মিললো রাসু ধাড়া’র। মুখে দাড়ি, পরনে লুঙ্গি, গেঞ্জি। সাংবাদিক দেখে হাতটা বের করলেন। ডান হাতের কব্জি থেকে নেই।

সবে এক বছর বিয়ে হয়েছে। কিছুটা দূরে কাজে গিয়েছিলাম। শুনেছি গ্রামে মারধর করা হচ্ছে। বাড়িতে এসে দেখি বাড়ি পুরো ফাঁকা। চাবি মেরে সবাই চলে গেছে। বাড়ির পিছন দিক দিয়ে পালাতে যেতেই ওরা আমাকে ধরে ফেললো। শোড দিয়ে আমার হাতের অনেকটা অংশ কেটে দেয়। অপরাধটা ছিল কংগ্রেস করতাম। ওঁরা এলাকায় বিরোধীদের শেষ করে দিতে চেয়েছিল। এখন দিদি আমাকে কাজ দিয়েছে। জল ধরো জল ভরো প্রকল্পে কাজ করছি। দুই মেয়ে, ছেলে নেই। বড় মেয়েকে এম.এ পাশ করিয়েছি। বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে বি.এ পাশ করেছে। বিয়ে এখনও হয়নি। এক হাতে কাজ করতে কষ্ট হয়। তবে চিন্তা একটা হয়। এখনও আসামীরা ঘুমিয়ে আছে। যদি আবার জেগে ওঠে আঘাত হানতে পারে।

কান্দুয়া গ্রামের দুয়ারে বসে গ্রামের এক বয়স্ক ব্যক্তি জানান, সেদিনের ভয়ঙ্কর ঘটনা শোনা মাত্র ছুটে আসেন তখনকার কংগ্রেস যুবনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঁচ কংগ্রেস কর্মীর পাশে এসে দাঁড়ান। আহত প্রত্যেকের হাতে ২০ হাজার টাকা করে তুলে দেন। ১৯৯১ সাল থেকে এখন ২০১৯ সাল দামোদর দিয়ে লক্ষ লক্ষ কিউসেক জল বয়ে গিয়েছে। আবার এক লোকসভা ভোট দুয়ারে এসে হাজির। কাদুয়া গ্রামের মানুষ সেদিনের কথা ভুলে থাকলেও ভোট আসলেই মনে পড়ে যায় সবকিছু। নেতাদের আনাগোনা শুরু হয়। রাতের অন্ধকারে কেউ কেউ এলাকা ঘুরে যায়। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করে। চিন্তাতো একটু হয়।

কান্দুয়া এলাকাটি আমতা ১নম্বর ব্লকের মধ্যে হলেও উদয়নারায়ণপুর বিধানসভা এবং উলুবেড়িয়া লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। দু কিমি রাস্তায় পিচ পড়বার আগের এবড়োখেবড়ো পাথরের উপর গুঁড়ো কচা দেওয়া হয়েছে। বাকি পিচের মোটা আস্তরণ পড়বার। পঞ্চায়েত ভোটে বিরোধী শূন্য থাকায় ভোট হয়নি। গ্রামের দেওয়ালে ফিকে হয়ে যাওয়া ছবি অবশ্য শাসকের আশ্বাস দিচ্ছে লোকসভা ভোটেও এখানে একছত্র রাজত্ব শাসক দলের। এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য কমল পাত্র জানান, ‘এলাকায় ঝুটঝামেলা আর নেই। উন্নয়নের জন্য মানুষ বদলে যেতে শিখেছে। সেদিনের আক্রান্ত কংগ্রেস কর্মী চম্পা পাত্র এখন তৃণমূলের পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য। দুষ্কৃতিরা শুধরে গিয়ে দলে ফিরে আসতে চাইছে। ওদের নামে এখন কেস চলছে। দলের সিদ্ধান্ত মেনেই আমরা চলবো’।

দুপাশে বিস্তীর্ণ জমি। মাথা তুলে থাকা বটগাছ, অশ্বত্থ গাছ, খেজুর গাছ, তাল গাছ। ধানের মড়াল, ছোট বড় পুকুর, হাঁস মুরগি সহ বিভিন্ন গবাদি পশুর সহবস্থান। কৃষক লাঙল ঘরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছে। বিরোধী বাম এখন উধাও। সেদিনকার অত্যাচারের ছবিটুকু স্মৃতিতে জমিয়ে এগিয়ে চলেছে নিজেদের মতো করে। তবুও গ্রামটার সাথে সন্ত্রাসের নাম জুড়ে থেকে গিয়েছে।

এছাড়াও চেক করুন

তৃণমূল কংগ্রেস কে তিনি “ভীতু” বলে কটাক্ষ ভারতী ঘোষের

কার্তিক গুহ, পশ্চিম মেদিনীপুর: “কেশপুরে তৃণমূল আমাদের ভয় পেয়েছে। তাই আমাদের আটকানোর জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা …

Leave a Reply

Your email address will not be published.